Read All Bangla Newspaper Online & Bangla News

Media Link Submission Media Directory, Journalism Jobs, Social Media, CNN News, BBC Weather, BBC World News, CBS, Health Insurance, Insurance in USA, Life Insurance, USA News, Daily News, Fox, Bangladesh News, India News, Pakistan News, Latest News

“বর্তমান কর ব্যবস্থায় চাপে সাধারণ মানুষ, বাড়ছে বৈষম্য”

বাংলাদেশের একজন উচ্চবিত্ত বা ধনী মানুষ পণ্য কিনতে যেহারে কর দেন, একজন শ্রমিক বা নিম্ন আয়ের মানুষও একইহারে কর দেন। ফলে একদিকে যেমন বৈষম্য বাড়ছে, অন্যদিকেসাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচও বাড়ছে। আবার বর্তমানকর ব্যবস্থায় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, ধনী ব্যক্তি ও বিভিন্নপ্রতিষ্ঠানকে অর্থপাচার ও কর ফাঁকিতে উৎসাহিত করছে। ফলেশেষমেশ দেশ চালাতে গিয়ে মানুষের উপর কর আরোপ করছেসরকার। ফলে জীবন চালাতে চাপে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।

মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে একশনএইডবাংলাদেশ আয়োজিত ‘জনগণের কর আদলত’ নামের একটিঅনুষ্ঠানে এমন কথা উঠে আসে।

একটি জনবান্ধব কর ব্যবস্থা প্রচলনে সরকার, বেসরকারিপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করতে এইআয়োজন করে প্রতিষ্ঠানটি। যেখানে দেশের সাতটি বিভাগথেকে আসা মানুষরা বলেন, দেশের বর্তমান কর ব্যবস্থাদারিদ্র্যবান্ধব নয়। সংসদে বাজেট ও কর নির্ধারণের ক্ষেত্রেগুরুত্ব পায় না দরিদ্রদের অবস্থান, বরং তাদের উপর চাপিয়েদেয়া হয় ভ্যাটের বোঝা। এমন প্রেক্ষাপটে সমতাভিত্তিক রাষ্ট্রগঠনে বৈষম্যহীন প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা চালু করতে হবে।এজন্য সরকারকে কর্পোরেট করের উপর মনোযোগী হতে হবে।

এই আদালতে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ কর ব্যবস্থাপনা নিয়েআরো বলেন, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির উপর সরকারআরোপিত মূল্য সংযোজন কর ব্যবস্থা একটি অসম বন্টন।বর্তমান ব্যবস্থায় মূল্য সংযোজন কর পোশাক শ্রমিক, শিক্ষার্থীও বস্তিবাসীসহ মধ্য ও নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য এক ধরনেরবোঝা এবং বৈষম্যমূলক। আবার বিদেশে অর্থপাচার, ধনীদেরট্যাক্স ফাঁকি কিংবা বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকির কারণেসরকার সাধারণ মানুষের উপর অতিরিক্ত কর আরোপ করেন।এ কারণে বাংলাদেশে বৈষম্য বাড়ছে বলে মনে করেন সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশা।

তিনি বলেন, “সংবিধানের সঙ্গে বাজেটের কোন মিল নেই।কারণ সংসদে যারা কর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তারা গরীবেরকথা ভাবেন না। বরঞ্চ, তাদের সিদ্ধান্তে ধনী, কর্পোরেট কিংবাবড় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বার্থই বেশি গুরুত্ব পায়। তাই সংসদেএবং বাজেটে জনবান্ধব কর নিয়ে খুব কম কথাই হয়। যারখেসারত দিতে হয় সাধারণ মানুষকে।”

‘কর আদালতে’ পাঁচটি বিষয়ে অভিযোগ উপস্থাপন করা হয়।প্রথম শুনানীতি পোশাক শ্রমিক ফাতেমা বেগম বলেন, “আমারমালিক পন্য রপ্তানিতে চার শতাংশ ভর্তুকি পান। আবারব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণও পান। অথচ সামান্য পরিমাণেবেতন বাড়াতে আমাদের রাস্তায় নামতে হয়। অন্যদিকে সীমিতআয়ে সংসার চালাতে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনতে মালিকেরসমপরিমাণ মূল্য সংযোজন কর দিতে হয় আমাদের। এটাকেমন কর ব্যবস্থা?”

বস্তিবাসী ফাতেমা আক্তার বলেন, “বস্তিতে বৈধ বিদ্যুতেরব্যবস্থা, গ্যাস সংযোগ, এমনকি বর্জ্য পরিস্কারের ব্যবস্থাও নেই।পানি ও পয়:নিষ্কাশনের জন্যও সরকার কোন সেবা দেয় না।অথচ বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ ও পানির বিল থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য যেমন ঔষধ, সাবান ও শিশুর লেখাপড়ারজিনিসপত্র কিনতে গেলে ভ্যাট দিচ্ছি আমরা। এমনকিমোবাইল ফোনে কথা বলতেও আমরা ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাটদিয়ে যাচ্ছি। অথচ প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবা পাই না। এজন্যবর্তমান কর কাঠামো ও সরকারের পরিচলনাই দায়ী।”

এরপরই কলেজ শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন বলেন, “শিক্ষা ব্যয়মেটাতে আমার বাবুর্চি বাবার মাসে খরচ হয় ৬৫০০ টাকা। এরমধ্যে ৪০০ টাকাই ভ্যাট। তিন বছরে বাসের ভাড়া বেড়েছে প্রায়আড়াইগুন। সবমিলিয়ে সেবা পেতে এবং ভ্যাটের কারণে বছরেসাড়ে নয় হাজার টাকা অতিরিক্ত গুনতে হয় আমারপরিবারকে। অথচ আমার পরিবারের আয় সেই অনুপাতেবাড়ছে না। ফলে শিক্ষা ব্যয় মিটাতে আমার পরিবারকেহিমশিম খেতে হচ্ছে।”

আরেকজন নগরবাসী ফজলুর রহমান অভিযোগ  করেন, “সরকার পণ্য উৎপাদনকারীদের উপর ভ্যাট বা ট্যাক্স বাড়ালেতারা তাদের পণ্যের দাম বাড়িয়ে তা সমন্বয় করেন। ফলে করেরটাকাটা শেষমেষ সাধারন মানুষের পকেট থেকেই যায়। আবারসেই পণ্য কিনতে গিয়ে আরও ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হয়সেই সাধারন মানুষদেরই। সুপারশপে কিনলে আরো ৪ শতাংশযোগ হয়। এতো কর দেয়ার পরও সরকারের সঠিক সেবাআমরা পাই না। প্রতিবছর বাজেট আসে মরার উপর খাড়ার ঘাহয়ে। বর্তমানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডেও আয়ের ৩৫ শতাংশইআসে সাধারন মানুষের কাছ থেকে। অথচ এটি হওয়ার কথাউল্টো”।

অভিযোগের এমিকাস কিউরি হিসেবে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়েরউন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলামবলেন, “কর অন্যায্যতা ও অযৌক্তিতার কারণে ভুক্তিভোগিহচ্ছেন সাধারন মানুষ। অতিরিক্ত কর দিয়েও রাষ্ট্রের কাছ থেকেযে সেবা পাচ্ছেন তা অপ্রতুল।”

দ্বিতীয় অধিবেশনে শুনানি হয় কর্পোরেট কর ফাঁকি ও এরপ্রভাব নিয়ে। এই অধিবেশনে এই বিষয়ে কিছু তথ্য উপস্থাপনকরা হয়। একশনএইড বাংলাদেশ-এর গবেষণা বলছে,সরকারের সঙ্গে চুক্তির ফাঁক দিয়ে বাংলাদেশে কাজ করাবহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবছর প্রায় ৭০০ কোটি টাকারকর ফাঁকি দিচ্ছে। জয়পুরহাট থেকে আসা একজনঅভিযোগকারী বলেন, “সরকার এই টাকা তোলার দিকে নজরনা দিয়ে সাধারন মানুষের উপর কর আদায়ে চাপ বাড়াচ্ছে।অথচ এই টাকা তুললে সেবাখাতে বিনিয়োগ বাড়তো। করেরবোঝা কমতো সাধারন মানুষের উপর থেকে।”

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যানুসারে, ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালপর্যন্ত ৮টি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ৩৪৫ কোটি টাকার কর ফাঁকিদিয়েছে। অন্যদিকে ৩টি টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানিসহ১০টি বহুজাতিক কোম্পানির সরকারের কাছে বকেয়া রয়েছে১৩ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া বিদেশে অর্থ পাচারতোহচ্ছেই।

অনুষ্ঠানের ধারণাপত্রে বলা হয়, বহুজাতিক কর্পোরেটকোম্পানির দ্বারা এই বিপুল পরিমাণ টাকার কর ফাঁকি ওঅর্থপাচার যদি রোধ করা সম্ভব হয় তাহলে বিদেশে অর্থ পাচারবন্ধ হবে। আর টাকা দিয়ে সাধারন জনগণের জন্য শিক্ষা ওস্বাস্থ্যসহ উপযুক্ত মানের নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা সম্ভবহবে। পাশাপাশি দেশে প্রচলিত কর প্রথার যেই অসম বন্টনব্যবস্থা রয়েছে তার প্রতিকার সম্ভব হবে। সাধারন জনগণেরমাথা থেকে ভ্যাটের বোঝাও কমবে।

জনগণের এই কর আদালতের বিচারক ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়েরঅর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এমএম আকাশ বলেন, “সরকারপ্রণীত নীতি ও আইনগুলো এমন যাতে রাজস্ব আয়ের বোঝাটাগিয়ে পড়ছে সাধারন মানুষের উপর। পরোক্ষ করের পরিমাণযেখানে কম হওয়ার কথা সেখানে সাধারন মানুষকেই সেই করবেশি দিতে হয়। অথচ বৈধ-অবৈধ উপায়ে হাজার হাজার কোটিটাকা দেশের বাইরে পাচার করছেন ক্ষমতাসীনরা। আবার করফাঁকিও দিচ্ছেন তারা। সেদিকে সরকার খেয়াল নেই। ফলেএখনও এদেশে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের মত জনগুরুত্বপূর্ণ খাতেসরকারের বিনিয়োগ কম। সাধারন মানুষ কর দিয়েও সেখানেসেবা পান না। এটি খুবই দু:খজনক।”

অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ও বিচারক ফারাহ্ কবির বলেন, “আমরাকর দিতে চাই। তবে সেই কর হওয়া উচিত সাধারন জনবান্ধব।সাধারন জনগোষ্ঠীর উপর থেকে ভ্যাটের বোঝা কমাতেবাংলাদেশ সরকারের কর্পোরেট কর আহরণের পরিমাণ বাড়াতেহবে। কারণ জাতীয় রাজস্বে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর করসামান্য পরিমাণেই যোগ হয়। ফলে সরকারকে ভিন্ন উপায়েযেমন ভ্যাটের উপর জোর দিতে হয় রাজস্ব আদায়ের জন্য। এইসুযোগে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কর ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছে। আরকরের ঘাটতির কারণে উন্নয়ন বাজেটের বরাদ্দ কমে যাচ্ছে, বিশেষ করে গণসেবা খাতসমূহে যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবংপ্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা খাতে। তাদেরবাজেট ঘাটতি এবং গরীব মানুষের উপর থেকে ভ্যাটের বোঝাকমাতে কর্পোরেট কর আদায়ের পরিমাণ বাড়াতে হবে।”

অন্যতম বিচারক মাননীয় সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশাবলেন, “কর জনগণ বান্ধব করে তুলতে সংসদে এমন পরিবেশতৈরি করতে হবে যেখানে বৈষম্যের কথা তুলে ধরা এবংপরিবর্তন আনা সম্ভব। কিন্তু সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠরাই করদিতে চায় না, ধনীদের কথা ভেবে কর ব্যবস্থা তৈরি করে।মানুষের মাঝে কর ও ভ্যাট বিষয়ক সচেতনতা বাড়াতে হবে, তৈরি করতে হবে জনগণবান্ধব রাজনৈতিক পরিবেশ। স্বচ্ছতা ওজবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের মধ্য দিয়ে গড়ে তুলতে হবেযৌক্তিক, নৈতিক ও বৈষম্যহীন কর ব্যবস্থা। আর সেজন্যপ্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা।”

অনুষ্ঠানে জনানো হয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেসমান্তরালে অবস্থানকারী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশেরকর সংগ্রহের হার এখনও অনেক কম। যা ২০০৯ থেকে ২০১৮অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭.৮ থেকে ১০.৩৯ শতাংশ। কিন্তুনেপালে এ অনুপাত ১৪ শতাংশ যেখানে বাংলাদেশে মাথাপিছুআয় নেপালের প্রায় দ্বিগুন। বিশেষজ্ঞদের মতে সরকার চাইলেইএই অনুপাত সহজেই ১৬ শতাংশে নিয়ে যেতে পারে। আর তারজন্য সরকারকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে কর্পোরেট করসহঅন্তর্ভুক্তিমূলক কর ব্যবস্থার উপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.